সোনারগাঁও এর দর্শনীয় স্থান দেখতে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক পাড়ি জমান। কেন বলুন তো? প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য মানব মনকে পুলকিত করে আর সেই সৌন্দর্য অবলোকন করতে কে না পছন্দ করে বলুন? সোনারগাঁও বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার একটি উপজেলা যা বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। চলুন সোনারগাঁওয়ে বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক-
সোনারগাঁও এর দর্শনীয় স্থান

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক এবং জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান সোনারগাঁও আপনাকে বিচিত্র তথ্য দিবে বলে আমরা মনে করি। কেননা, প্রকৃতির নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের প্রাকৃতিক দৃশ্যের আঁধার হচ্ছে এই সোনারগাঁও। চলুন ধারাবাহিকভাবে সোনারগাঁও এর দর্শনীয় স্থানগুলো সম্পর্কে সঠিক তথ্য জেনে আসি।
পানাম নগর

পানাম নগর একটি ঐতিহাসিক নগর আর এই নগরটি মসলিন শিল্পের জন্য বিখ্যাত। পানাম নগর বর্তমানে বাংলাদেশের একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ঐতিহাসিক স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। পানাম নগরের ইতিহাস বেশ পুরনো। প্রাথমিকভাবে এই নগরটি একটি ছোট গ্রাম ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এটি মসলিন শিল্পের জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠে। আপনি নিশ্চয় মসলিন কাপড়ের কথা শুনেছেন? মসলিন ছিল তখনকার সময়ের একটি অত্যন্ত মূল্যবান কাপড়। পানাম নগরের মসলিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হতো। মুঘলদের করাল গ্রাসের ফলে ঐতিহাসিক এই স্থান পানাম নগর ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর থেকে এই নগরটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে।
বাংলার তাজমহল

বাংলার তাজমহল একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা, যা আগ্রার তাজমহলের আদলে নির্মিত। এটি বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার পেরাব গ্রামে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। এই স্থাপনাটি ২০০৩ সালে নির্মিত হয়েছিল। সুতরাং বাংলার তাজমহলটি আগ্রার তাজমহলের একটি প্রতিরূপ। আগ্রার তাজমহলের মত এটিও মার্বেল পাথরে নির্মিত। তবে বাংলার তাজমহলটি আগ্রার তাজমহলের চেয়ে ছোট। এটি আগ্রার তাজমহলের প্রায় অর্ধেক আকারের।
বাংলার তাজমহলের অভ্যন্তরে আহসানউল্লাহ মনি এবং তার স্ত্রী রাজিয়ার কবরের স্থান সংরক্ষণ করা আছে। আহসানউল্লাহ মনি ছিলেন একজন বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক। তিনি এই তাজমহলটি নির্মাণ করেছিলেন তার স্ত্রী রাজিয়ার স্মরণে। এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি পর্যটন কেন্দ্র যা দেখার জন্য প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক আসেন। বাংলার তাজমহলটিতে প্রবেশের জন্য জনপ্রতি ১৫০ টাকা প্রবেশ ফি দিতে হয়।
লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর

লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরটি বাংলাদেশের একটি জাতীয় জাদুঘর। এই জাদুঘরে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোক ও কারুশিল্পের নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। এটি বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলায় অবস্থিত। এই জাদুঘরটি ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোক ও কারুশিল্পের নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। এই নিদর্শনগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, যেমন পাঞ্জাবি, শাড়ি, ধুতি, শার্ট, প্যান্ট ইত্যাদি। আবার, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী অলংকার, যেমন নাকফুল, দুল, চুড়ি, আংটি, হার ইত্যাদির দেখা মেলে এখানে। সেই সাথে, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী, যেমন বাদ্যযন্ত্র, খেলনা, আসবাবপত্র ইত্যাদি।
এছাড়াও এখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শিল্পকর্ম, যেমন নকশিকাঁথা, মৃৎশিল্প, কাঠের কাজ, ধাতুশিল্প দেখতে পাবেন। লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরটি বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান। এই জাদুঘরে ঘুরে দেখলে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী লোক ও কারুশিল্পের সাথে পরিচিত হওয়া যায়। তাহলে আপনি কি প্রস্তুত লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর দেখার জন্য। লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরটি সপ্তাহের সাত দিন খোলা থাকে। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাদুঘরটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। হাজারো স্মৃতি বিজড়িত এই জাদুঘরটিতে প্রবেশের জন্য জনপ্রতি ১০০ টাকা প্রবেশ ফি দিতে হয়।
জয়নুল আবেদিন স্মৃতি জাদুঘর

জয়নুল আবেদিন স্মৃতি জাদুঘরটি বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিনের স্মরণে নির্মিত। এই জাদুঘরে জয়নুল আবেদিনের বিভিন্ন চিত্রকর্ম ও অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত আছে। এটি বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলায় অবস্থিত। জাদুঘরটি ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই জাদুঘরে জয়নুল আবেদিনের আঁকা ছবি, ভাস্কর্য, লেখালেখি, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ইত্যাদি সংরক্ষিত আছে।
জয়নুল আবেদিন স্মৃতি জাদুঘরটি বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান। এই জাদুঘরে ঘুরে দেখলে আপনি জয়নুল আবেদিনের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এবং বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হওয়ার সুবিধা পাবেন অনায়াসেই। এই স্মৃতি জাদুঘরটি সপ্তাহের সাত দিন খোলা থাকে। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাদুঘরটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। এখানে প্রবেশের জন্য জনপ্রতি ৫০ টাকা প্রবেশ ফি দিতে হয়।
বারদী

বারদী সোনারগাঁ বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলার একটি গ্রাম। এই গ্রামটি তার প্রাচীন ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত। বারদী সোনারগাঁ বাংলার বার ভূঁইয়ার অন্যতম ঈশা খাঁর রাজধানী ছিল। ঈশা খাঁ ১৫৭৩ সালে এই গ্রামে তার রাজধানী স্থাপন করেন। ঈশা খাঁর রাজত্বকালে বারদী সোনারগাঁ অত্যন্ত সমৃদ্ধ জনপদ ছিল। এখানে অনেক মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ এবং অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিল। বারদী সোনারগাঁয় আপনি অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে পাবেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ঈশা খাঁর রাজবাড়ী, সোনালি মসজিদ, লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রম ইত্যাদি।
গোয়ালদী মসজিদ

গোয়ালদী মসজিদ বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। এই মসজিদটি ১৫১৯ সালে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে নির্মিত হয়েছিল। মসজিদটি তার সুন্দর স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত। গোয়ালদী মসজিদটি একটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ। মসজিদটির দৈর্ঘ্য ২৯ মিটার এবং প্রস্থ ১৪ মিটার। মসজিদের দেয়ালগুলি ইট দিয়ে তৈরি এবং দেয়ালে অনেকগুলি সুন্দর নকশা রয়েছে।
মসজিদের বাইরের দেয়ালে আরবি ভাষায় একটি শিলালিপি রয়েছে। শিলালিপিতে মসজিদটি নির্মাণের তথ্য রয়েছে। মসজিদের ভেতরের অংশটিও খুব সুন্দর। মসজিদের মেঝে মার্বেল পাথরে তৈরি। মসজিদের দেয়ালে এবং মেঝেতে অনেকগুলি সুন্দর নকশা রয়েছে। মসজিদের ভেতরে তিনটি মিহরাব রয়েছে। পানাম নগরের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে গোয়ালদী মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে।
পাঁচ পীরের মাজার

পাঁচ পীরের মাজার বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার ভাগলপুর গ্রামে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। এটি পাঁচজন ধর্মীয় ব্যক্তির সমাধি। পাঁচ পীরের নাম হচ্ছে হযরত শাহ সুলতান, হযরত শাহ হাবিবুল্লাহ, হযরত শাহ শাহাদাত, হযরত শাহ আলী, শাহ সুলতান জালাল উদ্দিন (রহঃ)। পাঁচ পীরের মাজারটি একটি ছোট্ট মসজিদের পাশে অবস্থিত। মসজিদটি ১৬শ শতকে নির্মিত হয়েছিল। পাঁচ পীরের এই মাজারটি একটি জনপ্রিয় ধর্মীয় তীর্থস্থান। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এই মাজারটিতে জিয়ারত করতে আসেন।
মাজারটি সপ্তাহের সাত দিন খোলা থাকে এবং সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। পাঁচ পীরের মাজারটিতে প্রবেশের জন্য কোন প্রবেশ ফি দিতে হয় না। এছাড়াও, সোনারগাঁওয়ে রয়েছে বেশ কিছু প্রাচীন মন্দির, মসজিদ, খানকা, বাড়িঘর ও অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপনা যা দেখলে আপনার হৃদয় জুড়ে যাবে নিশ্চিত। সুতরাং বলা যেতে পারে, সোনারগাঁও একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ স্থান। এই স্থানটিতে ঘুরে দেখলে বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিষয়ে নতুন নতুন তথ্য পেয়ে যাবেন।
বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন-উত্তর সমূহ
এক সময়ের বাংলার রাজধানী সোনারগাঁও অনেকগুলো দর্শনীয় স্থানে ভরপুর। তো প্রিয় পাঠক, সোনারগাঁও এর দর্শনীয় স্থানগুলো আপনার নিশ্চয় ভালো লেগেছে । সোনারগাঁও এর দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে জানার পরও নিশ্চয় আরও কিছু প্রশ্ন হয়তো আপনার মনে উঁকি দিচ্ছে। আসুন জেনে নেওয়া যাক সেই সকল প্রশ্ন এবং উত্তরসমূহ-
সোনারগাঁও এর প্রাচীন নাম কি?
সোনারগাঁওয়ের প্রাচীন নাম ছিল সুবর্ণগ্রাম। এই নামটি থেকেই সোনারগাঁও নামের উৎপত্তি হয়েছে। সুবর্ণগ্রাম শব্দের অর্থ হলো “সোনালি গ্রাম”। এই নামটি শহরের প্রাচীন সমৃদ্ধির প্রতিফলন।
সোনারগাঁও এর বিখ্যাত শিল্প কোনটি?
সোনারগাঁওয়ের বিখ্যাত শিল্প হল মসলিন। মসলিন ছিল একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম সুতির কাপড় যা একসময় বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত ছিল। মসলিন কাপড় এতই সূক্ষ্ম ছিল যে, একটি মসলিন শাড়ি এক হাতের মুঠোয় ধরা যেত। মসলিন কাপড়ের উৎপাদন এখনও সোনারগাঁওয়ে হয়।
উপসংহার
এতক্ষনে নিশ্চয় সোনারগাঁও এর দর্শনীয় স্থান দেখার জন্য আপনার মন উতলা হয়েছে? কেনইবা হবে না বলুন তো! এতসব সুন্দর আর মনোরম দৃশ্য যা মনকে প্রস্ফুটিত করে তার এক নাম হচ্ছে সোনারগাঁও। এছাড়াও আপনার জ্ঞানকে প্রসারিত করতে মিরপুরের দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে পড়তে পারেন।
‘সোনারগাঁও এর দর্শনীয় স্থান‘ সম্পর্কে আমাদের পোস্টটি আপনার ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে তাদেরকেও জানার সুযোগ করে দিন। আপনাদের সুস্বাস্থ্য কামণা করে আজকের মত আল্লাহ হাফেজ।